খেজুরের রস




সুধাংশু চক্রবর্তী




সকালে বাগানে ফুল তুলছি। কাঁধের বাঁকে দুটো মাটির হাঁড়ি ঝুলিয়ে একটি লোক সামনের বড় রাস্তাটা দিয়ে যেতে যেতে হাঁক দিলো, খেজুরের-র-র র-স-স-স।
শুনে ভারী লোভ হলো। কতকাল খেজুরের রস খাইনি। সেই ছেলেবেলায় খেয়েছিলাম তারপর আর খাওয়াই হয়নি। লোভ সম্বরণ করতে না পেরে ছুটে গেলাম। তারপর সাতপাঁচ না ভেবে এক হাঁড়ি খেজুরের রস কিনে নিয়ে স্ত্রীর হাতে দিয়ে বললাম, বেশ করে আঁচে জ্বাল দিয়ে রসটাকে সিকি হাঁড়িতে নামিয়ে এনে বানাও দিকি পায়েস।
স্ত্রী সেইমত জ্বাল দিয়ে ঘন রসের পায়েস বানালেন বেশ যুৎ করে। বিকেলে একবাটি ঠাণ্ডা পায়েস এনে আমায় ধরিয়ে দিলেন, নাও, খেয়ে দ্যাখো কেমন হয়েছে? সেই ছেলেবেলাকার স্বাদ পেলে কিনা বোলো।
পায়েস মুখে দিয়েই ‘ওয়াক্‌ থু’ করে উঠলাম। পায়েস ভেজা খড়ের গন্ধে যে ম’ম করছে! অবশ্য মিষ্টি হয়েছে যেমনটা হবার কথা ছিলো। শুনে স্ত্রীও মুখে তুললেন একচামচ পায়েস। তাঁরও সেই একই দশা হলো। রাগে মাথার ভেতরটা দপ দপ করতে লাগলো।
পরদিন সকালে ধরলাম লোকটাকে। সবটা শুনে দেঁতো হাসি দিয়ে বললো, আপনি নিশ্চয়ই আমার ভাইয়ের কাছ থেকে কিনেছেন। ওই ব্যাটার জন্যে আমার ব্যবসাটা দেখছি লাটে উঠবে। শুনলে অবাক হবেন বাবু। ওর কিন্তু একটাও খেজুরের গাছে নেই। খড় ভেজানো বাতাসার জল খেজুরের রস বলে বিক্রি করে। কি করে বানায় জানেন?
রাগত স্বরে বললাম, আমি কিন্তু তোমার কাছ থেকেই কিনেছি।
লোকটি সেই একই হাসি দিয়ে বললো, আপনিও অন্যদের মতো ভুল করলেন বাবু? আমরা দু’ভাই দেখতে যে একই রকম। শুধু ওর থুঁতনিতে ছোট্ট একটা কাটা দাগ রয়েছে। আজ বেরোয়নি। কাল সকালেই দেখবেন হাঁক পাড়তে পাড়তে যাচ্ছে এদিক দিয়ে। তখন গিয়ে ধরবেন। ছাড়বেন না কিছুতেই। রসের দামটা উশুল করে নেবেন। সেইসাথে দু-চারটা দাঁতও উপড়ে নিলে খুব ভালো হয়। আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকবো আপনার কাছে।
লোকটি চলে যাবার পর মনেমনে রপ্ত করে নিলাম দু’ভাইয়ের মধ্যেকার পার্থক্যটা। আগামীকাল সকালে মিলিয়ে নিতে হবে। ওকে ছাড়া যাবে না কোনোমতেই।
হায় রে, পরদিন থেকে তক্কে তক্কে থাকার পর আজ দু’বছর বাদ লোকটাকে ধরলাম। একবার হাতের কাছে পেয়েছি যখন খেজুর রসের দামটা উশুল করে তো নেবোই সেইসাথে দু-চারটা দাঁতও ভেঙ্গে নেবো সুদ বাবদ। লোকটাকে ডেকে দাঁড় করিয়ে তাকালাম ওর মুখের দিকে। ঐ তো থুঁতনিতে কাটা একটা দাগ! তারমানে ওর ভাই ঠিক কথাই বলেছে। সন্দেহ দূর হতেই একরাশ রাগ ঝরিয়ে দিলাম, খেজুরের রস বলে খড় ভেজানো জল খাইয়েছো তুমি। আজ ধরেছি যখন টাকাটা উশুল না করে ছাড়বো না।
- বলেন কি বাবু? আমার ঐ বজ্জাৎ ভাইটাকে আজও ধরতে পারেননি? ওর থুঁতনিতে কাটা দাগটা দেখেও না! ছি-ছি-ছি। এতো ভারী লজ্জার বিষয়।
- অমন কাটা দাগ তো তোমার মুখেই দেখছি। ঐ তো জ্বলজ্বল করছে তোমার থুঁতনিতে।
- ওহ্‌ এই কাটা দাগটার কথা বলছেন? গেল বছর খেজুর গাছ থেকে পড়ে গিয়ে থুঁতনি ফাটিয়েছি। এই দাগটা তারই সাক্ষী থেকে গেল। অথচ লোকে ভাবে আমি বুঝি সেই আমি নোই।
- বিশ্বাস হচ্ছে না। ধরা পড়ে গেছো বলে বানিয়ে বানিয়ে মিছে কথা বলছো।
- ঠিক আছে, আজ এক গেলাস রস আপনাকে মাগনাই খাওয়াচ্ছি। রসটা খেয়ে খাঁটী কি না তা নিজের মুখেই স্বীকার করুন।
ব্যাটাচ্ছেলে এক গেলাস রস খেতে দিলো একটা হাঁড়ি থেকে। নাক-মুখ কুঁচকে গেলাসে একটা চুমুক দিতেই আমার গোটা শরীরটা চনমন করে উঠলো খাঁটি খেজুরের রসের স্বাদে। ‘আহ্’ শব্দটা স্বেচ্ছায় বেরিয়ে এলো গলা থেকে।
- কি বলেছিলাম বাবু? এবার বিশ্বাস হয়েছে তো আমি ভেজাল জিনিস বেচি না। ওসব আমার ভাইয়ের কম্মো। ও বাবু, বলেন তো এক হাঁড়ি রস দিয়ে যাই আপনাকে?
খাঁটী খেরজুরের রসের মৌতাতেই এক হাঁড়ি রস কিনে লোকটিকে বিদেয় দিয়ে রসের হাঁড়িটা স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে বললাম, এবার আর ঠগবার কোনো চান্স নেই। বানাও দিকি খেজুরের রসের পায়েস। গরম গরম ফুলকো লুচি দিয়ে খাই।
সেই রসে পায়েস হলো। স্ত্রী একবাটি ঠাণ্ডা পায়েস আর গোটাকতক ফুলকো লুচি ধরিয়ে দিয়ে বললেন, নাও তোমার খেজুরের রসের পায়েস আর ফুলকো লুচি। তবে বাপু, একটা কথা না বলে থাকতে পারছি না। তেমন সুগন্ধ কিন্তু পেলাম না রস জ্বাল দেবার সময়। এবারও ঠকিয়ে গেল না তো!
স্ত্রীর কথাটা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে পায়েস মুখে দিয়েই ‘ওয়াক্‌ থু’ করে উঠলাম। ছ্যা-ছ্যা, খেজুরের গন্ধ কোথায়? পায়েস যে ভেজা খড়ের গন্ধে মম করছে ঠিক গেলবারের মতো! দাঁত কিড়মিড় করে বললাম, দাঁড়া ব্যাটাচ্ছেলে! এবার তোর হচ্ছে। তোর মুণ্ডু, তোর গুটিকতক হলুদ দাঁত, এমনকি তোর ঐ রসের হাঁড়িদুটোকেও না গুঁড়িয়ে দিয়েছি ডাণ্ডা মেরে তাহলে আমার নামে একটা কুকুর পুষিস।
(২)
দিনকয়েক চেষ্টার পর আজ সকালে সেই পরিচিত হাঁক শুনে ছুটলাম লোকটিকে ধরতে। কিন্তু ধরতে পারলাম না। ধরতে না পেরে হতাশ হয়ে ফিরে এলাম বাড়িতে। ঘরে এসে ঢোকামাত্র স্ত্রী হাসিমুখে এগিয়ে এসে শুধোলেন, লোকটাকে ধরেছো? ধরে কি বললে ওকে? টাকাটা ফেরত দিয়েছে? গুনে দেখেছো তো ঠিক টাকাটাই ফেরৎ দিয়েছে? কি গো, অমন হা করে তাকিয়ে আছো কেন? টাকাটা দাও দিকি, তুলে রাখি আলমারিতে।
একের পর এক প্রশ্নবান এসে আছড়ে পড়তে লাগলো আমার ওপর। কোন প্রশ্নের উত্তর আগে দেবো ভেবে আকুল হয়ে ঘামতে লাগলাম দরদর করে। স্ত্রী চুপ করে গিয়ে আমার দিকে তাকালেন বড়বড় চোখ করে। সেই চোখে যে-আগুন ঝরলো তাতে নিমেষেই অর্ধেকটা ভস্ম হয়ে গেলাম। ভস্ম হয়ে গুড়োগুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ার আগেই স্ত্রী চেপে ধরলেন আমার জামার কলার। তারপর প্রবল ঝাঁকুনি দিতে দিতেই আবার বলা শুরু করলেন, মিনসের মুখে কথা নেই কেন! লোকটাকে ধরতে পারোনি বুঝি? নাকি ধরেও ছেড়ে দিয়েছো? নাকি তোমার হাত-পা ধরে কান্নাকাটি করে টাকা কমিয়ে ছেড়েছে? নাকি টাকাটা আমার হাতে দেবে না বলে এখন নাটক করছো?
তিনি একটু থেমে দম নিয়ে আবার বলতে লাগলেন, ভালো করে শুনে রাখো মুখপোড়া মিনসে, টাকাটা যদি না এনে থাকো অথবা টাকাটা যদি কম এনে থাকো অথবা ভয় পেয়ে লোকটাকে যদি ছেড়ে দিয়ে থাকো অথবা টাকাটা দেবে না বলে যদি নাটক শুরু করে থাকো তাহলে কিন্তু আমার হাত............
প্রশ্নবাণের আঘাত সহ্য না করতে পেরে জ্ঞান হারিয়ে ঝুলে পড়লাম স্ত্রীর সবল হাতের মুঠোয়। ভেবেছিলাম জ্ঞান হারিয়ে নিস্তার পাবো স্ত্রীর হাত থেকে। সেই গুড়েও পড়লো বালি। স্ত্রী চোখেমুখে জলের ছিটে দিয়ে আমাকে আবার স্বনির্ভর করে তুলে বললেন, মনে রেখো, লোকটাকে ধরে টাকাটা উশুল না করা ইস্তক তোমার কিন্তু নিস্তার নেই আমার হাত থেকে।
সবে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়িয়েছি তখনই দরজার বাইরে থেকে একটা লোক হাঁক দিয়ে শুধোলো, ও বাবু, কাকে যেন কবে থেকেই খুঁজছেন শুনতে পাচ্ছি?
উঁকি দিয়ে দেখি শতচ্ছিন্ন পোষাকে একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে। আমাকে তাকাতে দেখে দু’পাটি হলুদ দাঁত বের করে শুধোলো, ক’দিন ধরেই কাকে যেন খুঁজছেন বাবু?
- যাকেই খুঁজি না কেন তাতে তোমার......কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারলাম না। মাঝপথেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। আরে, এই লোকটার থুঁতনিতেও কাটা দাগ যে রয়েছে! তাহলে এই লোকটাই কি সেই ঠগবাজ!
আমাকে সন্দেহের চোখে তাকাতে দেখে লোকটা সাতহাত দূরে সরে গিয়ে গম্ভীর গলায় বললো, জানতাম আপনি আমাকেই ধরবেন। শুনুন বাবু, আমি কিন্তু ঠকবাজ নোই। আমি হলেম গিয়ে ঐ ঠগবাজটার বাপ। আমিও ওকে খুঁজছি মাসখানেক ধরে। কিন্তু কোথায় যে ঘাপটি.........
তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, তুমি যদি ঠিকবাজ না হও তাহলে তোমার থুঁতনিতে ঐ কাটা দাগটা কেন? ঠকবাজটার তো অমনই একটা কাটা দাগ আছে থুঁতনিতে।
- ওহ্‌ এই কাটা দাগটার কথা বলছেন? এটা আমাদের বংশগত দাগ বাবু। আমাদের বংশের প্রত্যেকের মুখেই এমন কাটা দাগ দেখতে পাবেন।
- বংশগত দাগ! জন্মেও শুনিনি এমন কথা।
- আজ তো শুনলেন। সাথে এটাও জেনে রাখুন প্রতিটি বংশের মানুষদের শরীরেই কিছু না কিছু বংশগত দাগ থাকে।
আমি হা করে শুনছি তার কথা। লোকটা হঠাৎ বলে বসলো, আপনার শরীরেও কোনো না কোনো কোনো বংশগত দাগ রয়েছে বাবু। এখনো চোখে পড়েনি বুঝি? মুখ দেখে তো তেমনটাই মালুম হচ্ছে।
- কি আজেবাজে বকছো? তেমন কিছু থাকলে আমি কি জানতাম না?
- মোটেও আজেবাজে বকছি না বাবু। এত দূর থেকেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আপনার শরীরের ঐ বংশগত দাগটা। হলফ করে বলতে পারি অমন দাগ আপনার ছেলের শরীরেও আছে।
- কোথায় দেখলে সেই দাগ? দেখাও দেখি। দাঁড়াও, আগে ছেলেটাকে ডেকে আনি। বলেই হাঁক দিলাম, ওরে নেপু, একবার বাইরে আয় তো বাবা।
নেপু বেরিয়ে এলো আমার হাঁক শুনে। লোকটা আমাদের দু’জনকে একনজর দেখে নিয়ে সোল্লাসে বলে উঠলো, ঐ তো! দুজনের শরীরেই কালো জড়ুলের দাগ রয়েছে! কথাটা বলেই আমাদের পায়ের কালশিটে পরা দাগটা দেখিয়ে দিলো।
ছেলে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো। তার আগেই ওর মুখটা চেপে ধরে লোকটাকে বললাম, তুমি এখন যাও তো বাপু। একটু ব্যস্ত আছি। পরে একসময় কথা হবে এই নিয়ে।
লোকটা যেতে যেতেই বকবক করতে লাগলো, আমার ছেলেটাকে ধরতে পারলে একটু খবর দেবেন বাবু। আর আমি যদি আগে ধরতে পারি তাহলে......লোকটা চলে গেল চোখের আড়ালে।
লোকটাকে মিথ্যে কথা বলতে হলো। বলতে পারলাম না, এই কালো দাগটা জন্মগত নয় রে হতচ্ছাড়া। এটা আমার স্ত্রীরই হাতের কারসাজি। গত পরশু কি কারণে যেন রেগে গেছিলেন আমাদের এই বাপ-ব্যাটার ওপর। তাই খুব করে পিটিয়েছিলেন চ্যালাকাঠ দিয়ে। ছাড়া পেয়েছিলাম পায়ে এই কালশিটের দাগ উপহার পাবার পর।
(৩)
অপদস্তের একশেষ হতে হতে ঠিক করেছি ঠকবাজ লোকটাকে হাতের কাছে পেলেও আর ধরতে ছুটবো না। বারবার অপদস্ত হতে কার ভালো লাগে শুনি? আজও বাগানে জল দিচ্ছি রোজকার মতো। হঠাৎ কানে এলো সেই পরিচিত হাঁক, খে-জু-রে-র র-স-স। শুনেও না শোনার ভান করে জল দিয়ে চলেছি ফুলগাছের গোড়ায়। হঠাৎ কানের গোড়ায় ভেসে উঠলো ভোমরের ভনভনানি (তেমনটাই মনে হয়েছিল আমার)। হাত নাড়া দিয়ে ভোমরটাকে তাড়াতে যেতেই হাতটা সপাটে গিয়ে আছড়ে পড়লো কারও গালে। চমকে গিয়ে পেছন ফিরে দেখি স্ত্রী পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন গালে হাত দিয়ে। ব্যাস, সেই দেখেই আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যাবার জোগাড় হলো।
আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে যেতেই স্ত্রী জলদগম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন, কানের মাথা খেয়েছো নাকি? শুনতে পাচ্ছো না ঠকবাজ লোকটা হাঁক পাড়তে পাড়তে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে? যাও ধরো গিয়ে। তারপর আজ দেখছি তোমাদের দু’জনকেই।

অল্পতেই রক্ষা পেয়েছি দেখে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটলাম লোকটাকে ধরতে। হায় রে, লোকটা ততক্ষণে মিলিয়ে যে গেছে পাড়ারই কোনো একটা গলিতে। খানিকক্ষণ এদিক ওদিক করে অবশেষে খালি হাতেই ফিরে আসতে হলো ঘরে। আমাকে খালি হাতে ফিরে আসতে দেখেই স্ত্রী দু’চোখ দিয়ে আগুন ঝরিয়ে বলে উঠলেন, আজও ফসকেছো? এর ফল তো ভোগ করতেই হবে তোমাকে। তবে আজ তোমার দু-দুটো শাস্তি পাওনা হলো। একটা, ঐ ঠকবাজটাকে ধরতে না পারার জন্য। অন্যটা আমার গালে সপাটে চড় মারার জন্য।
কথাকয়টা বলেই দ্রুত কদমে ঢুকে গেলেন ঘরের ভেতর। কথাটা শুনে এবং তাঁর পা দাপিয়ে চলে যাওয়াটা দেখে ভয়ে কাঁপতে লাগলাম বাগানে দাঁড়িয়ে। হায় রে, আজও যদি চ্যালাকাঠ নিয়ে আসেন শাসন করতে তাহলে আমার পায়ের এই কালশিটে দাগটার, ঠকবাজটার বাপটা যাকে বংশগত জড়ুলের দাগ বলে চিনিয়ে গেছে, আজই বংশবৃদ্ধি যে ঘটবে! ঘণ্টা খানেক ভয়ে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পরও তাঁর দর্শন পেলাম না। অগত্যা সামান্য গলা তুলে তাঁকে ডেকে বললাম, কি গো আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো? চ্যালাকাঠটা খুঁজে পাওনি বুঝি? কাল বিকেলে নেপুকে দেখেছিলাম ওটা নিয়ে খেলতে। ওকেই একবার শুধোও না কোথায় রেখেছে। শাস্তিটাস্তি ভোগ করে ঘরে গিয়ে থিতু হই।
ঘরের ভেতর থেকে জবাব ভেসে এলো, সঙয়ের মতো দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরে এসো। একটা শাস্তি পেয়ে গেছো এতক্ষণে। চিন্তা কোরো না, দ্বিতীয়টাও সময়মতো পেয়ে যাবে।
দুরুদুরু বুকে ঘরে ঢুকতেই স্ত্রী বললেন, দ্বিতীয় শাস্তিটা আপাতত তোলা থাক। এখন যাও, স্নান সেরে এসে চাট্টি খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো দিকি।
রাত্রে বিছানায় এসে শোবার কিছুক্ষণ পরই স্ত্রীর চাপা গলা ভেসে এলো অন্ধকার ভেদ করে, কাল সকালে ঘুম থেকে উঠেই
সোয়েটার না পড়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবে। ঠকবাজ লোকটাকে ধরে আনতে পারলেই চা-বিস্কুট জুটবে তোমার কপালে।
সেইমতো কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে গায়ে পাঞ্জাবী চাপিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম রাস্তায়। ঘণ্টা দুয়েক কখন কেটে গেছে টেরও পাইনি। হঠাৎ দেখি স্ত্রী রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করে এগিয়ে আসছেন। দেখেই ভয়ে বেদম কাঁপতে শুরু করলাম। আমাকে কাঁপতে দেখে পথচারীদেরই একজন সহানুভূতি দেখিয়ে বলে গেলেন, আহা রে, দাদা যে শীতে কাঁপছেন! যা ঠাণ্ডা পড়েছে গত রাত থেকে। সোয়েটার ছাড়া লড়াই করতে নেমেছেন এই শীতের সঙ্গে? যান-যান, ঘরে গিয়ে সেঁধিয়ে থাকুন লেপের তলায়।
পথচারীটি চলে যাবার পরপরই স্ত্রী এসে বললেন, অনেক হয়েছে। এখন ঘরে চলো। চা-বিস্কুট খাইয়ে আগে ধাতস্ত করে নিই তোমাকে। তারপর শাস্তির কথা ভাবতে বসবো।
শাস্তির মুখে পড়তে হবে সেই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢুকে এসে চা-জলখাবার খেয়ে তৈরি হতে লাগলাম অফিসের জন্য। সেজেগুজে অফিসে বেরোতে যাবার মুখেই স্ত্রী হুকুম দিলেন, বিকেলে আসার সময় দামী একটা ট্যাব কিনে এনো।
তাঁকে নরম করতে চেয়ে অনুরাগ মেশানো গলায় শুধোলাম, ট্যাব কেন গো?
- ট্যাবটা কাল সকালই তোমার কপালে ঝুলবে।
সেই শুনেই আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার জোগাড় হলো। কথাটা একবার মুখ থেকে বার করেছেন যখন কিছু একটা গোল না বাঁধিয়ে ছাড়বেন না। অগত্যা সন্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বাসস্ট্যাণ্ডের দিকে হাঁটা দিলাম। অফিস ফেরৎ সবচেয়ে বড়ো ট্যাবটাই কিনে নিয়ে এলাম বাজার থেকে। রাতটা নির্ভাবনায় কেটে গেল। পরদিন ভোরেই স্ত্রী ঠেলে তুলে দিয়ে গম্ভীর গলায় আদেশ দিলেন, উঠে চোখেমুখে জল দিয়ে এসো তাড়াতাড়ি।
চোখেমুখে জল দিয়ে আসতেই তিনি নিজের হাতে আমাকে সাজিয়েগুছিয়ে দিলেন ফুলহাতা সোয়েটারে। তারপর গতকাল যা বলেছিলেন ঠিক সেটাই করে ছাড়লেন। ট্যাবটা রবার ব্যাণ্ডে বাঁধা হয়ে শোভা পেতে লাগলো আমার কপালে। স্ত্রী ট্যাবের মুভি রেকর্ডারটা চালিয়ে দিয়ে বললেন, এবার যাও। গিয়ে পাড়াময় টহল দিতে থাকো। ঐ ঠকবাজ লোকটার পেছন পেছন গিয়ে দেখে এবং ছবি তুলে নিয়ে এসো সে কোথায় থাকে। তারপর আমি গিয়ে......
কিছুটা হাঁটার থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম একটা ঘটনা দেখে। এই তল্লাটের ডাকসাইটে গুণ্ডা কাল্লুমস্তান তোল্লা তুলছে এই সাতসকালে! সদ্য দোকান খুলতে আসা দোকানদারটি তোল্লা দিতে অস্বীকার করায় কাল্লুর সাকরেদরা তাকে আংড়াধোলাই করছে রাস্তায় পেড়ে ফেলে। সেই দেখেই চট করে সেঁধিয়ে গেলাম একটা গলিতে। গলির অপর দিক থেকে ভেসে এলো সেই পরিচিত হাঁক, খে-জু-রে র রস-স-স-স। লোকটাকে চিনে নিতে এতটুকুও অসুবিধা হলো না। কিন্তু ওকে ধরলাম না। বরং সাবধান করে দিয়ে বললাম, ও ভাই ঠকবাজ, ভুলেও বড় রাস্তায় যেও না। কাল্লুমস্তান গুণ্ডামি করছে। তোমাকেও ছাড়বে না।
এ-গলি সে-গলি হয়ে ঘন্টাখানেক পর ঘরে ফিরতেই স্ত্রী এসে ছোঁ মেরে ট্যাবটা হাতিয়ে নিয়ে কি কি ছবি তুলেছি দেখতে বসলেন। আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মিঁউমিঁউ করে বললাম, লোকটাকে ধরতে মন চাইলো না গো। আহা বেচারা কাল্লুমস্তানের ভয়ে......
তিনি ততক্ষণে ট্যাবে দেখে ফেলেছেন কাল্লুমস্তানের কাণ্ডকারখানা। ট্যাব থেকে চোখ তুলে একমুখ হাসি দিয়ে বললেন, ধরোনি বেশ করেছো। এবার একটা কাজ করো দিকি। কাল্লুর এই ছবিটা এক্ষুনি জমা দিয়ে এসো টিভির সংবাদ চ্যানেলের দপ্তরে। বলবে স্ত্রী পাঠিয়েছেন ‘গলির বৌদি রিপোটিং হিয়ার’ বিভাগের জন্য।
পরদিন সকালে সংবাদ চ্যানেলের লোকজন চলে এলেন স্ত্রীর ছবি এবং বক্তব্য রেকর্ড করতে। ব্যাপারটা পাড়ার কারও জানতে বাকী রইলো না। নিমেষেই মানুষে মানুষে ছয়লাপ হয়ে গেল বাড়ির উঠোন। সেই ভিড়ের মাঝে হঠাৎ শোভা পেতে লাগলো বাঁকে ঝোলানো মাটির হাঁড়িদুটো। সেই দেখেই ঠকবাজ লোকটাকে ধরে করে এনে তুললাম বসার ঘরে। চা-বিস্কুট খাইয়ে ‘টিভিতে তোমাকে দেখা যাবে, তোমার রসের হাঁড়ি দুটোকেও’ ইত্যাদি ইত্যাদি বলে ভুলিয়ে ভালিয়ে বসিয়ে রেখেই ছুটলাম স্ত্রীর কাছে।
সংবাদ চ্যানেলের লোকগুলো চলে যাবার পর স্ত্রী এসে ঢুকলেন সেই ঘরে। হাতে বেশ কিছু উপহারের সামগ্রী নিয়ে। এসে প্রথমে দুটো হাঁড়িরই রস চেখে দেখলেন এক এক করে। তারপর ঠগবাজ লোকটাকে.........
পরের দৃশ্য এবং স্ত্রীর সংলাপগুলো আর সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে এলাম ঘর থেকে। বাইরে বেরিয়ে এসে একবুক স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। যাক্‌ বাবা, ঠকবাজ লোকটাকে বামাল সমেত তুলে দিতে পেরেছি স্ত্রীর হাতে। আহ্‌ কি শান্তি।